শিশুরা
যখন নিজের সম্পর্কে কথা বলতে থাকে বা বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ের পাঠ ছাড়া অন্য যে কোন বিষয়ের
উত্তর স্বাবলীলভাবে দেয়ার চেষ্টা করে তখন থেকেই শিশুর বুদ্ধি ও ভাষা বিকাশ হতে থাকে।
কিন্তু কোন কোন শিশু একেবারেই কথা বলতে চায় না এবং লেখাপড়ায়ও সফলতা পায় না। শিশু শিক্ষায়
বা পাঠের সফলতা নির্ভর করে শিশুর সাথে আপনার সহজ ও সাবলীল ভাব বিনিময়ের উপর। আপনি শিশুর
মনজগতের যত কাছাকাছি যেতে পারবেন ততো তাকে শেখানোর সুযোগ পাবেন এবং তারা আগ্রহ সহকারে
আপনার কাছ থেকে শিখতে চাইবে। তাই শিশুর সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। এই যোগাযোগ
বা ভাববিনিময় ২ ভাবে হতে পারে;
1.
মৌখিক
এবং2. অমৌখিক
মৌখিক ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো লক্ষ রাখতে হবে তা হলো-
· খুব উঁচু স্বরে কথা না বলা।
· আবার প্রয়োজনের চেয়ে খুব নিচু স্বরে কথা না বলা।
· সহজ ভাষায় এবং ধীরে ধীরে কথা বলা।
· শিশুরা যখন কথা বলবে তখন তাদের কথার মাঝে কথা না বলা। কথা বলা শেষ হলে উত্তর দেয়া।
· শিশুদের এমন প্রশ্ন করা যেখানে চিন্তা করার সুযোগ থাকে।
· তাদের সাথে নেতিবাচক কথা না বলা।
অমৌখিক ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো লক্ষ রাখতে হবে তা হলো-
· শিশুদের সামনে হাসিখুশি থাকা।
· শিশুদের চোখে চোখ রাখা কিন্তু একটানা চোখের দিকে তাকিয়ে না থাকা।
· শিশুদের সামনে আন্তরিকভাবে বসা।
· শিশুদের কথা মনযোগী দিয়ে আন্তরিকভাবে শোনা।
· শিশুদের উৎসাহবাচক কথায় মাথা নাড়ানো।
· শিশুদের কাছাকাছি যাওয়া।
· কথার ভাবের সাথে অঙ্গভঙ্গি ঠিক রাখা।
যে
শিশুরা একেবারেই কথা বলতে চায় না তাদেরকে কথা বলতে অভ্যস্ত করার জন্য আমাদের বেশি বেশি
প্রশ্ন করতে হবে। কিন্তু কী ধরণের প্রশ্ন করতে হবে? প্রশ্ন সাধারণত ৩ ধরণের হয়ে থাকে।
যেমন-
1.
বদ্ধ
প্রশ্ন2. উম্মক্ত প্রশ্ন এবং
3. প্রভাবিত প্রশ্ন।
বদ্ধ
প্রশ্ন: বদ্ধ প্রশ্ন
হলো যে প্রশ্নের উত্তর শুধু ’হ্যাঁ’
অথবা ’না’ দিয়ে দেয়া যায়। অথ্যাৎ উত্তরটি ’হ্যাঁ’ অথবা ’না’ এর মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকে। যেমন, ‘এ জায়গাটা খুব সুন্দর, তাই না?’ এ ধরণের প্রশ্নের উত্তরে শিশুকে
বেশি চিন্তা করার বা বেশি কথা বলার সুযোগ থাকে না। তাই শিশুর ভাষা বিকাশে তেমন সুযোগ
থাকে না।
উম্মক্ত
প্রশ্ন: যে প্রশ্নের
উত্তর দিতে উত্তরদাতাকে চিন্তা করতে হয়। শিশুকে চিন্তা করে নিজের মত করে উত্তর দিতে
হয় অথ্যাৎ নির্দিষ্ট কোন উত্তর হবে না। যেমন, এ জায়গাটা তোমার ভালো লাগে কেন? প্রশ্নকর্তা
জানে না, উত্তরদাতা কী উত্তর দিবে। প্রশ্নের উত্তর জনে জনে ভিন্ন হয়।
প্রভাবিত
প্রশ্ন: ”ফুলটা খুব
সুন্দর, তাই না?” এ ধরণের প্রশ্নে প্রশ্নকর্তা আগে থেকেই তার পছন্দের উত্তর আশা করে
অথ্যাৎ শিশু বা উত্তরদাতার উত্তরের প্রতি প্রভাবিত করে। এ ধরণের প্রশ্নে করলে শিশুরা
তাদের নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ পায় না বরং প্রশ্নকর্তার ইচ্ছা-অনিচ্ছানুযায়ী উত্তর
দেয়। যেমন, এ জায়গাটা কি তোমার ভালো লাগে? তাই এ ধরণের প্রশ্নের উত্তরে শিশুর ভাষার
বিকাশে তেমন একটা সহায়তা করে না।
শিশুদের
ঠিকভাবে প্রশ্ন করা ও উত্তর পাওয়ার মাধ্যমেই ভালোভাবে শিশুদরে সাথে যোগাযোগ স্থাপন
করা যায়। নিচের তিনটি প্রশ্ন দেখুন-

উপরের
তিনটি প্রশ্নের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কী পার্থক্য রয়েছে? কোন প্রশ্নটি জীবনদক্ষতা
শিখনের জন্য বেশি কার্যকরী? কেন?
·
প্রশ্ন
ক এর উত্তরে শুধুমাত্র ’হ্যাঁ’ অথবা ’না’ দিয়ে উত্তর দেওয়া যায়। প্রশ্নটির উত্তর একবার
দেওয়া হয়ে গেলে কথা চালিয়ে যেতে নতুন প্রশ্ন করতে হয়। সুতরাং এই প্রশ্নটি একটি বদ্ধ
প্রশ্ন।
·
প্রশ্ন
খ এর উত্তরে শুধুমাত্র ’হ্যাঁ’ অথবা ’না’ দিয়ে উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে প্রশ্ন-ক
এর মত এর উত্তরও খুব সংক্ষিপ্ত। উত্তরদাতাকে বেশি চিন্তা করতে হয় না, একটি মাত্র উত্তর
দেওয়ার সুযোগ পায়। এটাও একপ্রকার বদ্ধ প্রশ্ন।
·
প্রশ্ন
খ এর উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়, এটির উত্তর দীর্ঘ। এটার উত্তর দেওয়ার জন্য শিশুকে
চিন্তা করতে হয়, চট করে উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। এই প্রশ্নের অসেক উত্তর থাকতে পারে এবং
অসেক কথা বলার সুযোগ থাকে। এ ধরণের প্রশ্নকে বলে উম্মক্ত প্রশ্ন।
আমি
কি কখনই বদ্ধ প্রশ্ন ব্যবহার করবো না?-না,
তা নয়। আমাদের সাধারণ কথাবার্তায় আমরা বদ্ধ এবং উম্মক্ত উভয় ধরণের প্রশ্নই ব্যবহার
করে থাকি। অনেক সময় একটি বদ্ধ প্রশ্নও দীর্ঘ আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতে পারে। যেমন,
- তুমি কী কাজ করো?- তুমি কোথায় কাজ করো?
- সেখানে তোমার কাজ করতে কেমন লাগে?
তবে,
কোন কোন শিক্ষক বদ্ধ প্রশ্ন বেশি ব্যবহার করে থাকেন। তারা বিশ্বাস করেন যে, শিক্ষণ
হলো শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের কোনটা ঠিক এবং কোনটা ভুল তা বলে দেওয়া। আধুনিক শিক্ষণ
পদ্ধতিতে প্রশ্নকরণ আমাদের স্বাভাবিক কথাবার্তার প্রশ্নের মতই করা হয়ে থাকে। এভাবে
প্রশ্ন করে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলা এবং তারা কী বলে তা মনোযোগ দিয়ে শোনার মাধ্যমে
শিশুর সাথে গভীর যোগাযোগ স্থাপন করা যায় এবং জীবনদক্ষতা শিখনে কার্যকর।
নির্দিষ্ট
ও অস্পষ্ট প্রশ্ন: আমাদের
স্কুলে প্রথম পর্যায়ে যে শিশুরা পড়ে সে বয়সে সাধারণত বিমূর্ত চিন্তা শক্তির পূর্ণ বিকাশ
হয় না। ফলে সাধারণত, অসম্ভব, অস্পষ্ট প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তাদের জন্য কঠিন। যদি তারা
উত্তর দিতে সক্ষমও হয় তবে সে উত্তর হয় সাধারণ, বিমূর্ত ও অস্পষ্ট। সব হয়ত অর্থপূর্ণ
হবে না। নির্দিষ্ট প্রশ্ন বুঝতে সহজ হয এবং তাতে আপনি নির্দিষ্ট ও অর্থপূর্ণ উত্তর
পাবেন। তবে, নির্দিষ্ট প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার অর্থ বদ্ধ প্রশ্ন করা নয়। যেমন,
ক)
বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা কী?- এটা একটা অস্পষ্ট প্রশ্ন, বিমূর্ত এবং
বদ্ধ প্রশ্ন। কারণ এখানে শিক্ষকের মনে সম্ভাব্য সঠিক উত্তর আগে থেকেই ঠিক করা থাকে।
খ)
বিদ্যালয়ের কোন কোন সমস্যা আমাদের প্রথমে সমাধান করা উচিত?- এটা নির্দিষ্ট প্রশ্ন কিন্তু উম্মক্ত।
প্রশ্নটি শিশুদের সাথে জড়িত এবং কোন কিছু করার বিষয়ে সরাসরি বলা হয়েছে।
শিশুদের
এমন কোন সমস্যা সমাধানের প্রশ্ন করা যাবে না যা তাদের আয়ত্তের বাহিরে। যেমন, “দারিদ্র
দূর করতে সরকারের কী করা উচিত?” এই প্রশ্নে উত্তর দেওয়া ১০ বছরের শিশুর পক্ষে সম্ভব
নয়, এমনকি এর উত্তর অনেক বয়স্ক ব্যক্তির পক্ষেও কঠিন হয়ে যেতে পারে। এসব প্রশ্ন বেশি
বেশি করলে শিশুরা আপনার অন্যান্য কথার মনোযোগ হারাবে, আপনাকে দেখলে ভীত হয়ে উঠবে এবং
আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে।
আমরা
যে প্রশ্ন কম করবো-· বদ্ধ প্রশ্ন
· অস্পষ্ট ও বিমূর্ত প্রশ্ন
· ঘটনাবহুল প্রশ্ন
· সঠিক বা ভুল উত্তর
· একমুখী শিখন
আমরা যে প্রশ্ন বেশি করবো-
· উম্মক্ত প্রশ্ন
· নির্দিষ্ট প্রশ্ন
· অভিজ্ঞতাপূর্ণ প্রশ্ন
· মতামত ও নির্দেশনামূলক প্রশ্ন
· স্বাভাবিক প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র-
১. শিক্ষক সহায়িকা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড়, বাংলাদেশ।
২. এবিলিটি বেইজ শিখন সহায়ক বই।

0 comments:
Post a Comment