![]() |
| ছবি সংগ্রহ- গুগল |
প্রাচীন মুসলিম ইতিহাসের সর্ব
শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ, আলেম ও সুফি দার্শনিক বলা হয় মাওলানা জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি (রঃ) কে। এছাড়া তিনি ছিলেন ১৩ শতকের
একজন বিখ্যাত কবি, আইনজ্ঞ, ইসলামি ব্যক্তিত্ব। তার গুণকীর্তণ শুধু মুসলিম বিশ্বেই সীমাবদ্ধ
থাকেনি, বরং সাম্প্রদায়ীকতার গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সকল জাতি ও ধর্মের মানুষের
কাছে। জালাল উদ্দিন রুমির
বেশির ভাগই লেখা ফার্সি ভাষায়। রুমিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি এবং
বেস্ট সেলিং পয়েন্ট বলা হয়। তার কবিতা সারাবিশ্বে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।
ইউরোপ, মধ্যএশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের কাছে তিনি অনেক বেশি সমাদৃত।
জন্মঃ আরবি ৬০৪ হিজরি ৬ই রবিউল আউয়াল। বাংলা ১২০৭
সালে খোরাসানের বর্তমানে আফগানিস্থান বলখ
রাজ্যে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মাওলানা বাহারউদ্দীন ওলাদ এবং মায়ের
নাম ছিল মুইমিনা খাতুন। তৎকালিন সময়ে তার পিতা ছিলেন অতি সম্মানিত দ্বীনি আলেম।
তাকে বলা হতো সুলতানুল ওলামা (আলেম সমাজের রাজা)। রাজ্যের ছোট বড় সাধারণ মানুষ
থেকে শুরু করে রাজ্যের রাজা, মহারাজা, পীর, মুরীদ, আলেম ও মুহাদ্দিসরা রুমির
পিতাকে খুব সম্মান করতেন। মাওলানা রুমীর পিতামহ হোসাইন ইবনে আহমেদ অতি উচ্চ পর্যায়ের সুফী এবং বুজুর্গ লোক ছিলেন। তৎকালীন সুলতান এবং বাদশাহগন তাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। খোরাসান হতে ইরাক পর্যন্ত এই
সাম্রাজ্যের মহাপ্রতাপশালী বাদশাহ মুহাম্মদ শাহ খাওয়ারেযমী স্বীয় কন্যা মালাকায়ে জাহানকে তার সহিত বিবাহ দেন। মাওলানা রুমীর বুজুর্গ পিতা সুলতান বাহাউদ্দিন ওলাদও তৎকালের উচ্চশ্রেণীর ওলি, বিজ্ঞ আলেম, আধ্যাত্মিক সুফি এবং বিশিষ্টজন। মাওলানা রুমি হলেন বাদশাহ মুহাম্মদ শাহ খাওরেযমীর দৌহিত্র।
মাওলানা রুমির বাল্যকালঃ মাওলানা রুমি পাথমিক
জীবনে সারা দিন হাদিস, কোরআন, তাফসির ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বই পড়ে সময়
কাটাতেন। তার পিতা ও পিতামহ যেহুত ধার্মিক, আধ্যাত্বিক ও ইসলামিক ব্যক্তিত্ব
ছিলেন, সেহুত মাওলানা রুমির চারিদিকে ছিল বিশাল বিশাল জ্ঞানের বই। সেইসব বই স্পর্শ
করে তার দিন কাটতো। আর তার মা মুইমিনা খাতুন খোয়ারিজমী রাজবংশের বংশধর হওয়ায় শৈশব থেকেই রুমি সমাজের উঁচু স্তরের লোকজনদের সাথে মিলেমিশে বড় হতে থাকেন।
কথাবার্তা, আচার-আচরণ,
লেখা-পড়া ইত্যাদি সব কিছু থেকেই মাওলানা রুমি অন্যান্য বাচ্চাদের থেকে একটু আলাদা।
৫ বছর বয়স থেকে তার ভিতর একজন পরিপূর্ণ মানুষের আচরণ পরিলক্ষিত হয়। বাল্যকাল থেকেই
তিনি অন্যান্য বাচ্চাদের ন্যায় খেলাধুলা আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত থাকতে পছন্দ করতেন না।
ধর্মীয় ও আধ্যাত্নিক বিষয় আলোচনা করতে পছন্দ করতেন। ৬ বছর থেকে তিনি রোজা রাখতে
শুরু করেন। ৭ বছর বয়স থেকে পবিত্র কোরআন শুদ্ধ ভাবে তেলাওয়াত করতে পারতেন।
বালখ শহরের রাজার সাথে এক বিবাদের
জের ধরে বাহারউদ্দিন ওয়ালাদ তার পরিবার এবং তার কয়েকশ অনুসারী কে সাথে নিয়ে মধপ্রাচ্যের
বিভিন্ন দেশে হিজরতের জন্য বের হন। রুমির বয়স যখন ১১ বছর। আর এই হিজরত চলাকালেই রুমির
সাথে সাক্ষাৎ ঘটতে থাকে সে সময়ের বিখ্যাত সব মনিষীদের। তার ১৮ বছর বয়সে মক্কা যাওয়ার
পথে নিশাপুরে তাদের সাথে দেখা হয় পারস্যের বিখ্যাত আধ্যাত্মিক কবি হযরত খাজা ফরীদুদ্দীন আত্তার (রহ) এর সাথে। তিনি
রুমিকে তার বাবার পেছনে হাঁটতে দেখে বলে ওঠেন,”একটি হ্রদের পেছনে একটি সমুদ্র যাচ্ছে”।
তিনি রুমিকে ইহজগতের আত্মার উপর লেখা একটি বই ‘আসারনামা’ উপহার দেন।
যা রুমির কিশোর বয়সে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তিনি রহস্যের উপরে আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন।
সুলতানুল উলামা মাওলানা
বাহারউদ্দীন ওলাদের মুরীদগণের মধ্যে সাইয়্যেদ বুরহানুদ্দীন তিরমিযী তত্ত্বজ্ঞানী
এবং উচ্চ শ্রেণীর আলেম ছিলেন। মাওলানা রুমির পিতা তার শিক্ষা-দীক্ষা ও তরবিয়তের
ভার উক্ত সৈয়্যদ বোরহানুদ্দীনের উপর অর্পণ করেছিলেন। মাওলানা অধিকাংশ বিষয়ের
শিক্ষালাভ বোরহানুদ্দীনের সাহেবের নিকট হতে করেছিলেন। আর প্রাথমিক শিক্ষা লাভ
করেছিলেন স্বীয় বুযুর্গ পিতার নিকট হতে।
বিবাহ বন্ধনে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমিঃ হিজরত চলার সময় কারামানে থাকা অবস্থায় ১২২৫ সালে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি গওহর খাতুনকে বিয়ে করেন তখন তাঁর বয়স ছিল
১৯ বছর। তাদের
দুইজন ছেলে ছিল- বাহারউদ্দিন মোহাম্মদ সুলতান ওয়ালাদ এবং আলাউদ্দিন মোহাম্মদ চালাবী। গওহর খাতুন মারা গেলে রুমি এক বিধবা মহিলাকে বিয়ে করেন, যার আগে একটি মেয়ে ছিল কিমিয়া খাতুন নামে। এখানে রুমির এক ছেলে আমির আলিম চালাবী এবং এক মেয়ে মালাখী খাতুনের জন্ম হয়।
শিক্ষা ও কর্ম জীবনঃ মাওলানা
জালালউদ্দিন রুমীর পারিবারিক কাজই ছিল ইসলাম প্রচার। বিশেষত হানাফী মাজহাবের
প্রচারণা করা। পরিবারের
এই ঐতিহ্যকে মাওলানা রুমি এবং সুলতান ওয়ালাদ অব্যাহত রেখেছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর
বাহারউদ্দিন মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। উত্তরাধিকারসূত্রে
তিনি তাঁর পিতার পদ পান একজন ইসলামিক মৌলভি হিসাবে। তার পিতার একজন ছাত্র, সৈয়দ বুরহান উদ্দিন মোহাক্কিক
তীরমিযি, রুমিকে
শরীয়াহ এবং তরীকা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে থাকেন। বিশেষ করে তাঁর পিতার দিকগুলো।
ওস্তাদ সৈয়দ বুরহান উদ্দিন মোহাক্কিক তীরমিযি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ নয়
বছর ধরে রুমী, তার কাছ থেকে সূফীবাদ শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর রুমির
প্রকৃতভাবে কর্ম জীবন শুরু হয়।
রূমের বাদশাহ আলাউদ্দীন কায়কোবাদ মাওলানা রুমীর জন্য একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন এবং প্রচুর সম্পদ এই
মাদ্রাসার জন্য ওয়াকফ করে দেন। মাদ্রাসার নাম রাখা হল- মাদ্রাসায়ে
খোদাওয়ান্দেগার। মাওলানা রুমী একজন ইসলামী ফকিহ্ বা
আইনজ্ঞ হন, ফতওয়া প্রকাশ করেন এবং কোনিয়ার মসজিদে নৈতিকতা বক্তিতা দিতে
থাকেন। তিনি মাদ্রাসাতে একজন মৌলভি হিসাবে কাজ করেন এবং তাঁর অনুগামীদের ইসলামিক জ্ঞান দেন। ৬৩০ হিজরী পিতার মৃত্যুর
দুই বছর পর জালালউদ্দিন রুমী জ্ঞাওনের বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য সিরিয়া
গমন করেন। সেখানে তিনি হালাবিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং ছাত্রাবাসে থেকে মনোযোগের
সাথে অধ্যয়ন করতে থাকেন। ছাত্র জীবনেই তিনি সাহিত্য, ফেকাহ, হাদীস, তাফসীর এবং
বিজ্ঞান, দর্শন ও তরক-শাস্ত্রে এমন পূর্ণ জ্ঞান ও বুৎপত্তি লাভ করেন। যে কোনো জটিল
ও কঠিন মাসয়ালা উপস্থিত হলে তা যদি কেউ সমাধান করতে না পারত, তবে লোকে মাওলানা
রুমীর নিকট নিয়ে আসত এবং রুমী (র) খুব সহজেই উক্ত সমস্যার সমাধান দিতেন। তিনি এত
সুন্দর, নিখুঁত, এবং প্রাঞ্জল ভাষায় হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে বর্ণনা করতেন, যা কিতাবে
পাওয়া যেত না। বলা হয়ে থাকে তিনি সেখানে চার বছর অতিবাহিত করেন।
শামসে
তাবরিজি ও
জালালউদ্দিন রুমীর
সাক্ষাৎঃ
৬৩৪ কিংবা ৬৩৫ হিজরীতে মাওলানা রুমি স্থায়ী ভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে দামেস্ক হতে পুনরায় কাউনিয়ায় আগমন করেন। ১২৪৪ সালে দরবেশ শামস তাবরিজি এর সাথে সাক্ষাৎ হয় যেটি তাঁর জীবন সম্পূর্ণরুপে বদলে দেয়। একজন সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষক এবং আইনজ্ঞ থেকে মাওলানা রুমী একজন সাধুতে রূপান্তরিত হয়। মাওলানা রুমী নিজেই বলেছেন, “সমগ্র রুমের অধিবাসী
রাজা, বাদশাহ, ধনী, বণিক, উলামা, মাশায়েখ, এবং আমীর-উমারা যতদিন জালালউদ্দিনের গোলাম
ছিল, ততদিন জালালউদ্দিন ছিল মৌলবী জালালউদ্দিন কাউনাবী, কিন্তু যেদিন ক্রীতদাসরূপে
নিজেকে শামসে তাবরিযীর চরণে লুটিয়ে দিলাম, সেদিন হতে আমার হল মাওলায়ে রুমী”।
আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী শামস তাবরিজি একজন ইরানী সুফী ব্যক্তিত্ব। তাঁকে জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমীর আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবেও মানা হয়ে থাকে। শামস তাবরিজি হন্যে হয়ে চারদিকে একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু ও মুরশিদ খুঁজতেছিলেন। ঘটনাক্রমে তিনি রুমীর কথা জানতে পারেন। কাউনিয়ায় পৌছে শক্কর ব্যবসায়ী (হালওয়ায়ী)-এর সরাইখানায় উপস্থিত হলেন। এদিকে মাওলানা রুমী (র) কাশফের সাহায্যে তাবরিজি (র)-এর কাউনিয়ায় আগমন-সংবাদ জানতে পেরে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সঙ্গে চলল আলেম, তালেবে এলম, মুরীদ-ভক্তদের বিরাট দল। সারা পথে লোকেরা তাঁর কদমবুসী করতে লাগল, এই অবস্থায় তিনি সরাইখানায় উপস্থিত হলেন। শামসে তাবরিজি জালালউদ্দিন রূমিকে দেখা মাত্রই বুঝতে পারলেন যে, ইনিই সেই ব্যক্তি যার সম্বন্ধে গায়েব হতে শুভ-সংবাদ প্রদান করা হয়েছিল। উভয় বুজুর্গের চারি চক্ষু মিলিত হলে অনেকক্ষণ পর্যন্ত উভয়ের মধ্যে নীরব ভাষায় কথাবার্তা চলতে থাকল। অতঃপর প্রথমে শামস তাবরজি মাওলানা রুমীকে জিজ্ঞেস করলেন, “হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর এই দুটি পরস্পর বিরোধী অবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য কেমন করে হতে পারে? এক দিকে তাঁর অবস্থা এরূপ ছিল যে, হুজুর(স) কিরূপে খরবু্জা আহার করেছিলেন তা না জানার কারণে তিনি আজীবন খরব ভক্ষণ করেন নি। মাওলানা রুমী তৎক্ষণাৎ
উত্তর দিলেন, বায়েজিদ বোস্তামী (র) যদিও অতি উচ্চ শ্রেণীর বুযুর্গ ছিলেন, কিন্তু
অলিত্বের পথে তিনি এক নির্দিষ্ট মকামে পৌছে থেমে গেলেন। পক্ষান্তরে হযরত
রাসুলুল্লাহ (স) আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যলাভের পথে এক স্তর হতে অন্য স্তরে ক্রমশঃ
উন্নতি করতেছিলেন। সুতরাং যখন উন্নত স্তরে পৌছতেন, তখন নিম্নস্তরের প্রতি লক্ষ্য
করে উহাকে এত ত্রুটিপূর্ণ দেখতে পেতেন যে, উহার জন্য আল্লাহ তা’আলার দরবারে
ইস্তেগফার করতে থাকেন।” আবার কেউ কেউ সাক্ষাতের প্রথম-পর্ব নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেন
যে, একদিন মাওলানা জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমী শাহী জাকজমকের সাথে বাহনে আরুঢ়
অবস্থায় কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে শামস তাবরিজি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে জিজ্ঞাসা
করলেন, “সাধ্য-সাধনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য কি?” মাওলানা রুমী উত্তর দিলেন,
“শরীয়তের বিধি-বিধান, আহকাম-আরকান সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করা।” শামস তাবরিজি
বললেন, “না, না, উদ্দেশ্য এই যে, যার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা হচ্ছে তার
সান্নিধ্যে উপনীত হওয়া।” অতঃপর হাকীম সানাঈর এই বয়েত আবৃত্তি করলেন,
“যেই এলম তোমাকে তোমা হতে ছিনিয়ে নিয়ে তার
ক্রোড়ে ধারণ না করে, ঐ এলম হতে অজ্ঞতা শত গুণে ভাল।”
অন্য আর একটি বর্ণনায় আছে যে, একদিন মাওলানা
রুমী একটি হাওযের কিনারায় বসে আছেন। সম্মুখে কতিপয় কিতাব রক্ষিত ছিল। হযরত শামস
(র) প্রশ্ন করলেন, “এগুলি কি?” মাওলানা উত্তরে বললেন, “ইহা বিজ্ঞান দর্শনের
কথোপকথন, এগুলিতে তোমার কি মতলব?” হযরত ইহা শ্রবণমাত্র তৎক্ষণাৎ কিতাবগুলিকে
হাওযের মধ্যে নিক্ষেপ করে দিলেন। এতে মাওলানা রুমীর অন্তরে ভীষণ আঘাত লাগল। শামস
তাবরিজিকে (র) উদ্দেশ্য করে বললেন, “ওহে দরবেশ! তুমি এমন সম্পদ বিনষ্ট করেছ, যা
এখন আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এই কিতাবগুলিতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন সূক্ষতত্ত্ব লিপিবদ্ধ
ছিল, যার বিনিময় দুষ্প্রাপ্য।” ইহা শুনে শামস হাওযের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সমস্ত
কিতাব হাওযের মধ্য হতে উঠিয়ে কিনারায় রাখলেন । সমুদয় কিতাৰ পর্বের ন্যায়
সম্পূর্ণ শুষ্ক ছিল, আর্দ্রতার লেশমাত্রও তাতে ছিল না। এতে মাওলানা রুমি অতিশয়
আশ্চর্যান্বিত হলেন। শামস তাবরিজি (র) বললেন, ইহা বাস্তব জগতের অবস্থাসমূহের
বিষয়বস্তু, তুমি ইহা কি বুঝবে?
আবার কোন কোন জীবনী লেখক সাক্ষাৎ-পর্বের সাথে
ঘটনাবলী বর্ণনা করেছেন। মাওলানা রুমী শাসস তাবরিজির খেদমতে প্রথমে উপস্থিত হন নাই;
বরং স্বয়ং মাওলানা শামসই মাওলানা রুমীর খেদমতে হাজির হয়েছিলেন। মাওলানা রুমী
স্বীয় বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। আর চারপাশে জ্ঞানান্বেষী ছাত্রদের ভীড়, আশেপাশে
রাশি রাশি কিতাব বিরাট বিরাট স্তুপাকারে রক্ষিত।
হঠাৎ শামস তাবরিজি (র) তথায় উপস্থিত হয়ে সালামান্তে ছাত্রদের সাথে মিশে বসে গেলেন। কিয়ৎকাল চুপ থাকার পর কিতাবরাশির দিকে ইশারা করে জিজ্ঞাসা করলেন, “ইহা কি জিনিস?”
মাওলানা উত্তর করলেন, “ইহা ঐ বস্তু, যা তুমি জান না।” একথা বলার সাথে সাথেই কিতাবসমূহে আগুন লেগে গেল, দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকল। এহা দেখে মাওলানা রুমী হতবাক হয়ে শামসকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ইহা কি ব্যাপার? শামস উত্তর দিলেন, “ইহা ঐ ব্যাপার যা তুমি জান না।”
হঠাৎ শামস তাবরিজি (র) তথায় উপস্থিত হয়ে সালামান্তে ছাত্রদের সাথে মিশে বসে গেলেন। কিয়ৎকাল চুপ থাকার পর কিতাবরাশির দিকে ইশারা করে জিজ্ঞাসা করলেন, “ইহা কি জিনিস?”
মাওলানা উত্তর করলেন, “ইহা ঐ বস্তু, যা তুমি জান না।” একথা বলার সাথে সাথেই কিতাবসমূহে আগুন লেগে গেল, দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকল। এহা দেখে মাওলানা রুমী হতবাক হয়ে শামসকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ইহা কি ব্যাপার? শামস উত্তর দিলেন, “ইহা ঐ ব্যাপার যা তুমি জান না।”
মাওলানা রুমী যখন প্রত্যেক কাজে
শামস তাবরিযীর অনুসরণ করতে লাগলেন এবং ক্রমে ক্রমে যাহেরী এলম ও পার্থিবতার সাথে যাবতীয়
সম্পর্ক চ্ছেদ হতে লাগল, তখন এই ব্যাপারটি মাওলানার শাগরেদ, মুরীদ ও ভক্তদের অন্তরে
বিরাট আঘাত হানল। এই অসন্তোষের সাথে সাথে তারা আশ্চর্যবোধ করতে লাগল। কেননা, শামসদ
তাবরিজির হাল-হাকীকত তাদের জানা ছিল না। মুরীদ-ভক্তগণ মনে মনে ভাবছিলেন, আমাদের জীবন
মাওলানার খেদমতে কাটল, মাওলানা, কাশফ-কারামত প্রত্যক্ষ করেছে, দেশ-বিদেশের সর্বত্র
মাওলানার যশ-খ্যাতি ছড়িয়ে আছে। এমতাবস্থায় নাম-ধামবিহীন কোথাকার এক লোক এসে মাওলানাকে
সবকিছু হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এখন তার চেহারা দর্শনও আমাদের ভাগ্যে জোটে না। শিক্ষাদান,
ওয়ায-নছীহত করা, ফতওয়া দেয়া একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই এই ব্যক্তি কোন জাদুকর
বা বিরাট ধুরন্ধর লোক হবে। নতুবা কার সাধ্য যে, পর্বততুল্য মহামানবকে একটি তৃণের ন্যায়
ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
শামস
তাব্রিজের এস্কের টানে মাওলানা রুমীর এমন বেহাল দশা হয়ে যাওয়ায় তার ভক্ত
মুরিদান এবং মাওলানা রুমির আপন পুত্র আলাওউদ্দিন শামস তাব্রিজকে এই দুনিয়া থেকে
চিরদিনের জন্য সরিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র শুরু করল। এভাবে অনেক দিন গত
হওয়ার পর শামস তাব্রিজ ও মাওলানা রুমী একদিন জ্ঞানের আলোচনা করতে বসলে শামস তাব্রিজ
হঠাৎ করে বলে উঠলে এখন আমাকে চির বিদায় দাও "হে রুমী, মৃত্যুর দূত আমাকে
নিয়ে যাবার জন্য ইশারা দিয়ে ডাকছেন"। এই কথা বলতে বলতে তিনি
একটু সামনে এগোলেই মাওলান রুমির আপন ছেলে আলাওউদ্দিন ও তার সঙ্গীরা এক বড় খঞ্জর
দিয়ে শামস তাব্রিজকে পিছন থেকে আঘাত করলে শামস তাব্রিজ এত জোরে চীৎকার দেন যে চীৎকার
শুনে হত্যা কারিরা সঙ্গে সঙ্গে বেহুশ হয়ে মারা যান।
কিছু পর দেখা গেল সেই জায়গায় শামস তাব্রিজের মৃত দেহ আর নাই শুধু পরে আছে ছোপ ছোপ লাল
রক্ত,সেদিন মাওলানা রুমি নিজের ছেলের এই দুষ্কৃতি দেখে এতই মর্মাহত হন যে তিনি তার
ছেলের জানাজাও পড়েন নি। প্রথমে তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে
পারেননি শামস তাবরিজি মারা গিয়েছেন। তাই তিনি লেখেন,
“কে বলে, যে অমর সে
মারা গিয়েছে?
কে বলে, আশার সূর্য মারা গিয়েছে?
কে বলে, আশার সূর্য মারা গিয়েছে?
ঐ দেখো, এ তো সূর্যের
শক্র যে ছাদে এসেছে,
এবং চোখ বন্ধ করে
চিৎকার করে বলছে, "হে, সূর্যের মৃত্যু হয়েছে।"
বন্ধুর
প্রতি ভালোবাসা তাকে করে তোলে প্রেমের ও বন্ধুত্বের কবি। তিনি লেখেন,
"তুমি
চলে গেলে আমার চোখ দিয়ে রক্ত বাহিত হলো। আমি কেঁদে কেঁদে রক্তের নদী বহালাম।
দুঃখগুলো শাখা-প্রশাখা বেড়ে বড় হলো, দুঃখের জন্ম হলো। তুমি চলে
গেলে, এখন আমি কীভাবে কাঁদবো? শুধু তুমি চলে গেছো তা-ই নয়, তোমার সাথে
সাথে তো আমার চোখও চলে গেছে। চোখ ছাড়া এখন আমি কীভাবে কাঁদবো প্রিয়!”
পরবর্তীতে শামস
তাব্রিজের বিরহ বিচ্ছেদ ও এশকে মাতোয়ারা হয়ে রচনা করেন ”দেওয়ানে শামস তাব্রিজ” ও ”মসনবি
শরিফ” নামক বিশ্ব নন্দিত জ্ঞানের কিতাব যা বিশ্বের দরবারে আজও সুপরিচিত
হয়ে আছে।
শেখ
সালাহুদ্দীনের সহিত সাক্ষাৎঃ শামস তাবরিজির মৃত্যুর
বেশ কয়েক বছর পর রুমীর আবার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সালাউদ্দীন জাকুব নামক এক
স্বর্ণকারের সঙ্গে। তিনি একদিন সালাউদ্দিন জাকুবের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন
এমন সময় তার হাতুড়ির আঘাতের শব্দ শুনে তিনি নাচতে শুরু করেন, তিনি জাকুবের হাতুড়ির
আঘাতের শব্দের মাঝে যেন সৃষ্টিকর্তার করুণার সুর শুনতে পান, আর এভাবেই তাদের
বন্ধুত্বের সূচনা হয়। সালাহুদ্দীনকে পেয়ে হযরত শামস-এর বিচ্ছেদ-যাতনার কিছুটা উপশম হল। এরপর থেকে দীর্ঘদিন
যাবত জাকুব রুমির ঘনিষ্ঠ সহচরী হয়ে ছিলেন। রুমী তার বড় ছেলের সাথে সালাউদ্দিন
জাকুবের মেয়ের বিয়ে দেন।
সালাহুদ্দীন এবং রুমীর অন্তরঙ্গতা দর্শনে আত্মীয়-স্বজন, মুরীদ ও
ভক্তগণের অন্তরে আবার ক্রোধানল জ্বলে উঠল এবং কানাঘুষা চলতে থাকল যে, শামসই ভাল
ছিল, অন্ততঃ সে তো আলেম ছিল, সালাহুদ্দীনতো আমাদের এখানকার একজন স্বর্ণকার। সারা
জীবন চাদির পাত বনিয়েছে সুতরাং শামসের ন্যায় এর অন্তরেও আঘাত হানার চেষ্টা চলতে
লাগল। অবশেষে তারা ভাবল, এই ব্যবস্থায় তার সহিত মাওলানার সম্পর্ক শিথিল হবে না।
সুতরাং তারা এই সংকল্প বর্জন করল। মাওলানা দশ বৎসর তাঁর সাহচর্য লাভ করার পর শেখ
সালাহুদ্দীন হঠাৎ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন; তিন-চার দিন পর ৬৫৭ হিজরীর ১লা মহরম শেখ
সালাহুদ্দীন পরলোক গমন করেন। মাওলানা অতি সম্মানের সহিত স্বীয় পিতার মাজারের নিকট
তাঁকে সমাহিত করেন।
হুসামুদ্দীন
চেলপীর এবং রুমির বন্ধুত্বঃ সালাউদ্দিন জাকুবের মৃত্যুর পর রুমির এক ছাত্র হুসামুদ্দীন আল চেলেপীর
সাথে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। হুসাম আল চেলেপীকে তিনি ‘দিয়া আল-হাক’ বলে ডাকতেন। যার
অর্থ ছিল ‘সত্যের প্রদীপ’। তার পরামর্শেই রুমি তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রন্থ 'মাসনাভি'
লেখা শুরু করেন। মাসনাভির মাঝে ১৩ শতকের সূফীবাদের বেশ নিদর্শন পাওয়া যায়। এছাড়াও রুমি
মাসনাভিতে ফুটিয়ে তুলেছেন শামস তাবরিজি, সালাউদ্দিন জাকুব এবং হুসাম আল চেলেপীর প্রতি
তার ভালোবাসার কথা।
হুসামুদ্দীন চালপী হিজরী ৬২২ সালে কাউনিয়ায়
জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে সাইয়্যেদ বুরহানুদ্দীনের নিকট মুরীদ হন। তাঁর পরলোক গমনের
পর মাওলানা রূমির নিকট মুরীদ হন। তিনি শামস তাবরিজি এবং শেখ সালাহুদ্দীনের ভক্ত
ছিলেন, তাঁদের নিকট হতেও ফয়েজ লাভ করেন। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন এবং মাওলানার সাথে
ঘনিষ্ঠতা স্থাপিত হওয়ার পর নিজের সকল চাকর-বাকর, দাস-দাসীকে আদেশ করলেন, তারা যেন
নিজ নিজ পছন্দমত কাজ-কারবার করে। ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ সম্পত্তি মাওলানা জালালউদ্দিন
রূমির খেদমতে বিলিয়ে দিলেন। সর্বশেষে ক্রীতদাসগুলিকেও আযাদ করে দিলেন। তিনি
মাওলানার সাথে এরূপ আদব রক্ষা করে চলতেন যে, মাওলানার ওযুখানায় কখনও ওযু করতেন
না। কোন কোন শীতের রাত্রে শীতের অত্যন্ত প্রকোপ হত এমন কি, তুষারপাতও হত।
এমতাবস্থায় স্বীয় বাড়িতে গিয়ে ওজু করে আসতেন। অপর দিকে মাওলানা রুমীও
হুসামুদ্দীন চালপীকে যথাসম্ভব সম্মান করতেন। তাঁর ব্যবহারে দর্শকবৃন্দ মনে করত,
ইনি মাওলানার পীর ও মুরশিদ। মাওলানা হুসামুদ্দীন চালপীর সাথে মাওলানা রূমীর এমন
প্রগাঢ় মহব্বত ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। যে, চালপী নিকটে না থাকলে মাওলানা রুমী কে বিমর্ষ ও বিষন্ন দেখাত। যেই মজলিসে চালপী
উপস্থিত না থাকতেন, মাওলানাকে সেখানে অবসাদগ্রস্থ মনে হত। তাছাউফের সূক্ষ্মতত্ত্ব
ও মারেফত এর গূঢ় রহস্য বর্ণনায় তার আগ্রহ থাকত না। এই রহস্য সম্পর্কে যারা অবগত
ছিলেন, তারা সর্বাপেক্ষা এই বিষয়কেই গুরুত্ব দিতেন যে, চালপী যেন হামেশা উপস্থিত
থাকেন, যাতে ফয়েযের সমুদ্র পুরোপুরি প্রবাহিত হয়। তিনি পনের বৎসর তার সাহচর্যে
ছিলেন। মাওলানার ইন্তেকালের পর তিনি মাওলানার স্থলাভিষিক্ত হন। কেননা, মাওলানা রুমী তাঁকে স্বীয় খলীফা নির্বাচিত করেছিলেন।
মাওলানার মহাপ্রয়াণের ১১ বৎসর পর তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন।
মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির জীবনী সমাপ্ত অধ্যায়ঃ
৬৭২ হিজরীতে একদিন তুরস্কের
কাউনিয়ায় প্রচন্ড ভূকম্পন আরম্ভ হল। শহরবাসীরা ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি
করতে লাগল। অবশেষে মাওলানার নিকট এসে বলল, হযরত! এটা কেমন আসমানী গজব আরম্ভ হল? মাওলানা
রুমী বললেন, যমীন ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছে, নতুন ও টাটকা
গ্রাস চাচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, অচিরেই তার আশা পূর্ণ হবে। এর কয়েকদিন পরে মাওলানা রুমী শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ল । বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ
চিকিৎসা করতে লাগলেন, কিন্তু চিকিৎসকগণ রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থ হলেন। অবশেষে তারা বলল,
আপনি কিরূপ কষ্ট বোধ করছেন তা আপনি নিজে ব্যক্ত করুন। মাওলানা সেদিকে বিন্দুমাত্রও
কর্ণপাত করলেন না। তখন লোকেরা মনে করল, মাওলানা রুমী আর সামান্য সময়ের মেহমান মাত্র। রোগের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
শহরবাসীরা দলে দলে মাওলানা রুমীকে দেখতে আসতে লাগলেন। বাদশাহ, আমীর, আলেম, শায়খ প্রত্যেক
শ্রেণির লোক আসতে লাগলেন এবং মাওলানার অবস্থা দেখে উচ্চ স্বরে রোদন করতে লাগলেন। পৃথিবী থেকে চলে যাবার আগে তিনি তার মৃত্যু সম্পর্কে কিছু
উক্তি করে গেছেন তা হল, যেদিন আমি মরে যাব, আমার কফিন এগিয়ে যাবে সেদিন ভেবো
না, আমার অন্তর এই ধরাধামে রয়ে গেছে! তোমরা অযথা অশ্রু বিসর্জন দিও না, হা-হুতাশ
করো না ‘হায়রে লোকটা চলে গেল’ এই বলে বিলাপ করো না। আমার সমাধিকে অশ্রুজলে
কর্দমাক্ত করে দিও না। আমিতো মহামিলনের মহাযাত্রার অভিযাত্রী। আমায় কবরে শোয়ালে
‘বিদায়’ জানাবে না, কবরতো ইহকাল-পরকালের মাঝে একটা পর্দা মাত্র অনন্ত আশীর্বাদের
ফোয়ারা। তোমরা অবতরণ দেখেছ এবার চেয়ে দেখ আমার আরোহণ। চন্দ্র-সূর্যের অস্তাগমন কি
বিপজ্জনক? তোমাদের কাছে যেটা অস্তাগমন, আসলে সেটাই উদয়ন।
অবশেষে ৬৭২ হিজরীর ৫ই জমাদাসসানী রবিবার দিন সূর্যাস্তের সময় হযরত মাওলানা জালালউদ্দিন
রুমী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু ভক্তরা তার ভালোবাসায় এতই আবেগ আপ্লুত হয়ে
পড়েন যে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত চর্তুদিক হতে বিভিন্ন দেশের লোকজন মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে
আসতে লাগল। তখন হতে শুরু করে আজও মাওলানা জালালউদ্দিন রুমীর সমাধি জিয়ারতগাহ রুপে
পরিগণিত হয়ে আসছে। মৃত্যুকালে মাওলানা রুমীর বয়স ছিল ৬৮ বৎসর।
বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তাঃ মাওলানা রুমীর কবিতার সতেজ
ভাষা এবং ছন্দ সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নিতো। তার প্রতিটি শব্দ শুনে মনে হতো এগুলো
সাধারণ ভাষা নয়, মানুষের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনের অনুবাদ, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের
ভাষা। তিনি তার কবিতাগুলো বা গজলগুলো লেখার অনুপ্রেরণা পেতেন তার পারিপার্শ্বিকতা থেকেই।
কখনো বা তিনি আরো বিশ্বাস করতেন ভালোবাসাই সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পাওয়ার সর্বোত্তম পন্থা।
এজন্য তিনি বলেছিলেন,
“স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর অজস্র পথ আছে।
তার মাঝে আমি প্রেমকে বেছে নিলাম।"
একবার তিনি বাজারের উপর দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। ছেলেরা তার হাত চুম্বন
করার জন্য দৌড়ে আসতে লাগল । তা দেখে তিনি দাড়ায়ে হাত প্রসারিত করে দিলেন। মাওলানাও
তাদের হাতে চুমো খেতেন। অদূরে একটি ছেলে কোন কাজে মশগুল ছিল। সে বলল, মাওলানা একট অপেক্ষা
করুন, আমি আমার হাতের কাজ শেষ করে আপনার হাত চুম্বন করব। ছেলেটি তার কাজ হতে অবসর না
হওয়া পর্যন্ত মাওলানা ঐ স্থানে দাড়িয়ে ছিলেন। ছেলেটি কাজ শেষ করে এসে মাওলানার হাত
চুম্বন করার পর তিনি নিজের গন্তব্য স্থানে চলে গেলেন।
অনেক
আধুনিক পাশ্চাত্যের কাছে তাঁর শিক্ষা সুফিবাদের দর্শন ও অনুশীলনের অন্যতম সেরা পরিচয়।
পশ্চিমে শাহরাম শিব প্রায় বিশ বছর ধরে রুমির কবিতার অনুবাদ শিখিয়েছেন, সম্পাদনা করছেন
এবং ভাগ করে নিচ্ছেন এবং বিশ্বের ইংরেজীভাষী অংশগুলিতে রুমীর উত্তরাধিকার ছড়িয়ে দেওয়ার
ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন।কোলম্যান বার্কসের রুমি কবিতার ইংরেজি ব্যাখ্যা
বিশ্বব্যাপী অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি অনুলিপি বিক্রি করেছে এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের
সর্বাধিক বহুল পঠিত কবি হলেন মাওলানা রুমী। পাকিস্তানের জাতীয় কবি মুহাম্মদ ইকবালও
রুমীর রচনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁকে তাঁর আধ্যাত্মিক নেতা হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন,
তাঁর কবিতাগুলিতে তাকে "পীর রুমী" হিসাবে সম্বোধন করেছিলেন। আজ রুমীর কবিতা
শোনা যায় গীর্জা, উপাসনালযয়ে ও জেন মঠগুলিতে পাশাপাশি শহরতলিতে। নিউ ইয়র্কের শিল্প
ও সংগীত দৃশ্যেও দেখা যায় রুমীর সূফী নৃত্য। রুমীর কবিতাগুলির রেকর্ডিংগুলি যুক্তরাষ্ট্রের
বিলবোর্ডের শীর্ষ ২০ তালিকায় স্থান পেয়েছে। অধ্যাপক মজিদ এম নাইনির মতে, "রুমীর
জীবন ও রূপান্তর সত্য ধর্মীয় ও পটভূমির লোকেরা শান্তিতে ও সম্প্রীতিতে একত্রে বসবাস
করতে পারে তার সত্য সাক্ষ্য এবং প্রমাণ দেয়। রুমীর দর্শন, শব্দ এবং জীবন আমাদের কীভাবে
অন্তর্নির্মিত শান্তি এবং সুখকে পৌঁছাতে শেখায় তা তাই অবশেষে আমরা বৈরিতা ও বিদ্বেষের
ধারাবাহিক ধারাটি বন্ধ করতে পারি এবং সত্যিকারের বিশ্বব্যাপী শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জন
করতে পারি।”
এছাড়া
রুমির কবিতা অনেকগুলি ধ্রুপদী ইরানী ও আফগান সংগীতের ভিত্তি তৈরি করে। তাঁর কবিতার
সমসাময়িক শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা মুহম্মদ রেজা শাজারিয়ান, শাহরাম নাজেরী, দাউদ আজাদ
(ইরান থেকে তিনজন) এবং ওস্তাদ মোহাম্মদ হাশেম চিশতী (আফগানিস্তান) করেছেন। রুমি প্রায়ই তার অনুসারীদের নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে
যেতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতির মাঝে ঈশ্বর অদৃশ্য জগতের বার্তা ছড়িয়ে দেন।
তিনি প্রকৃতিকে ঈশ্বরের ভালোবাসার প্রতিফলন রূপে দেখতেন এবং সেখান থেকে কবিতা গজল রচনা
করার অনুপ্রেরণা পেতেন। তিনি বলেছিলেন,
“প্রত্যেক বৃক্ষপত্র অদৃশ্য জগতের বার্তা
বহন করে। চেয়ে দেখো, প্রতিটি ঝরা পাতায় কল্যাণ রয়েছে।"
রুমী
ভক্তের কারণে উত্তর ভারতের একটি বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক রয়েছে, রুমি গেট নামে পরিচিত,
মাওলানা রুমীর নামকরণ করা হয়েছে লখনউতে (উত্তর প্রদেশের রাজধানী)
‘সূফী নৃত্য’ বা ‘সামার’ সূচনাঃ মাওলানা রুমীর মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে সুলতান ওয়ালাদ এবং এবং
শিষ্য হুসাম আল চেলেবি রুমীর অনুসারীদের নিয়ে মৌলভী সম্প্রদায় গড়ে তোলেন, যারা বর্তমানে
তুর্কিস্থানের ‘ঘূর্ণায়মান দরবেশ’ নামে পরিচিত। রুমি তার কবিতা বা গজল গাওয়ার সময় যে
ঘূর্ণায়মান নৃত্যে মেতে উঠতেন, তার নির্দিষ্ট কোনো ধরন ছিলো না। সুলতান ওয়ালাদ পরবর্তীতে
এই নাচের অনুসরণ করে তার বাবার সম্মানার্থে একটি নির্দিষ্ট ধরনের নাচের সূচনা করেন,
যেখানে একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্রে রাখা হয় রুমির রূপক হিসেবে এবং বাকিরা তাকে ঘিরে গোল
করে ঘুরতে থাকে, যেভাবে সূর্যের চারপাশে গ্রহরা ঘুরে থাকে। আর এভাবেই রুমি নয় বরঞ্চ
সুলতান ওয়ালদের হাত ধরে বিখ্যাত ‘সূফী নৃত্য’ বা ‘সামার’ সূচনা ঘটে। রুমীর বিভিন্ন
কবিতা এবং গানের পাশাপাশি ‘ফিহি মা ফিহি’ নামে তার বিভিন্ন উক্তির সংগ্রহ পাওয়া যায়,
যা তার অনুসারীরা এবং বন্ধুরা বিভিন্ন সময় লিখে রেখেছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন
ব্যক্তিকে লেখা তার বেশ কিছু চিঠিও পাওয়া গিয়েছে।
মাওলানা
রুমীর চিন্তা-চেতনা বা ধারণাগুলোকে আসলে কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা সম্ভব নয়। অনেক
সময় এদের নিজেদের মাঝেই বিভিন্ন পার্থক্য ও বৈচিত্র্য দেখা যায়। তার বিভিন্ন রূপকের
ব্যবহার এবং ধারণার পরিবর্তনশীলতা অনেক সময় পাঠকদের ধাঁধায় ফেলে দেয়। তার কবিতা বা
লেখাগুলো আসলে বিভিন্ন রহস্যময় ও বিচিত্র অভিজ্ঞতায় মানুষের অভিব্যক্তিরই প্রতিফলন
যেখানে মানুষ তার প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন অনুভূতিকে খুঁজে পায়। তাই তো জালাল উদ্দিন
মুহাম্মদ রুমীকে কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠী দিয়ে বেঁধে ফেলা সম্ভব নয়, কারণ তিনি
সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয়ের কথা বলেছেন। তিনি সবকিছু হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন। আর এ
কারণেই তিনি সকলের হৃদয়ের সাথে মিশে গেছেন।
তথ্য সংগ্রহঃ-
মাওলানা মুহাম্মদ আহসান হাবীব অনুবাদিত মসনবী শরীফ
বিভিন্ন বাংলা ব্লগ এবং উইকিপিডিয়া থেকে
মাইকেল এইচ. হার্ট

0 comments:
Post a Comment