RECENT COMMENTS

শিশুকে দ্রুত বাংলা বানান ও রিড়িং পড়া শিখানোর কৌশল;

বাংলা বানান করা এবং দ্রুত রিড়িং পড়তে পারার জন্য আগে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ জানতে হবে। বর্ণ পরিচয়ের পর জানতে হবে ‘কার’ চিহ্ন ও ‘ফলা’ চিহ্ন কী? বাংলা বানানে এবং দ্রুত রিড়িং পড়তে পারার জন্য কার ও ফলার উচ্চারণের উপর কেন এত গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন?

‘কার’ চিহ্ন: বাংলা স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে ‘কার’ বলা হয় । আরও একটু ষ্পষ্ঠ করে বললে স্বরবর্ণ যখন ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে যুক্ত আকারে বসে তখন স্ববর্ণের পূর্ণরূপ না বসে সংক্ষিপ্ত আকারে বসে বসে। স্বরবর্ণের সে সংক্ষিপ্ত রূপকে কার বলে। স্বরবর্ণ ১১ টি। একমাত্র অ ছাড়া , আ থেকে ঔ পর্যন্ত মোট ১০ টি স্বরবর্ণের ‘কার’ চিহ্ন আছে। যেমন- আ-কার, ই-কার, ঈ-কার, উ-কার, ঊ-কার, ঋ-কার, এ-কার, ঐ-কার, ও-কার, ঔ-কার।

‘কার’ চিহ্ন: ব্যঞ্জনবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে বলা হয় ‘ফলা’। অর্থাৎ, ব্যঞ্জনবর্ণ কোনো কোনো স্বর কিংবা অন্য ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত হলে এর রূপ বা আকৃতির পরিবর্তন হয় বা সংক্ষিপ্ত হয়। তাই ব্যঞ্জনবর্ণের আশ্রিত সংক্ষিপ্ত রূপকে বলা হয় ফলা।

ফলা ছয়টি যথা; য, ব, ম, র, ল ও ন-ফলা। ব্যঞ্জনবর্ণের ফলা ছয়টি যথা; য, ব, ম, র, ল ও ন-ফলা।

উপরোক্ত বিষয়গুলো আপনারা জানেন তবুও আরকেটু স্মরণ করিয়ে দিলাম। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনাদেরকে অবহিত করতে চাই। কারণ বিষয়টি আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। আপনি যদি মনে করেন আপনার বাচ্চা প্রাইমারী শিক্ষা শেষ করার আগেই বাংলা বানান ও রিড়িং পড়তে পারবে, তাহলে ভুল ভেবে বসে আছেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কেন অধিকসংখ্যক বাচ্চারা ভালোভাবে রিড়িং পড়তে পারে না তার কিছু কারণ আমরা জানবো এবং কি করলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনিতে পড়া অবস্থায় অনর্গল রিড়িং পড়তে পারবে তার কিছু কৌশল শিখবো ইনশাআল্লাহ।

আনুষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের মূল স্থান হলো বিদ্যালয়। তার প্রথম মঞ্চ হলো প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি। একটি শিশু বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে শুনে, বলে ও দেখে বর্ণ পরিচয়ের সামান্য অংশ শিখে। আমাদের শিক্ষাক্রম অনুযায়ী নিজের পরিচয়সহ বর্ণ পরিচয় শেখার প্রথম ধাপ হলো প্রথম শ্রেণি। প্রথম শ্রেণিতে শেখানো হয় বর্ণ পরিচয় এবং বর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ। এজন্য প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণি পার করার পরও শিশুরা বাংলা বানান ও রিডিং ভালোভাবে আয়োত্ত্ব করতে পারে না। শিক্ষাক্রম, পাঠ্যক্রম এবং আমাদের অবহেলার কারণে শিশুরা শিক্ষার সূচনা পর্বে দূর্বল থেকে যায়।

প্রথম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে স্বরবর্ণেরর কার চিহ্ন আছে। কিন্তু ব্যঞ্জনবর্ণের ফলা চিহ্ন নাই। অথচ বাংলা বানানে এবং রিডিং করে পড়তে ‘কার’ ও ‘ফলা’ চিহ্নের গুরুত্ব অনেক। পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষকের সহায়তায় পাঠ্যপুস্তক দেখে হাতে কলমে ‘কার’ চিহ্ন শিখে। কিন্তু ফলা চিহ্ন পাঠ্যপুস্তকে না থাকায় অভিভাবক বা শুধু শিক্ষকের সহায়তায় শিখতে পারে। ফলা চিহ্নের লিখিত রূপ শিশু পাঠ্যপুস্তকে পাবে প্রাথমিকের ধাপ পার করে মাধ্যমিকে গিয়ে বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ বইয়ে। যেটা তার প্রথম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে থাকার কথা ছিল। বর্ণ শেখার পর শব্দ এবং বাক্য গঠনের জন্য স্বরবর্ণের কার চিহ্ন এবং ব্যঞ্জনবর্ণের ফলা চিহ্নের সমান ভূমিকা।

শিশুরা যাতে দ্রুত বাংলা বানান করতে পারে এবং অনর্গল রিড়িং পড়তে পারে এজন্য নিন্মের কৌশল অবলম্বন করতে পারি:

ধাপ-১: প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে শিশুকে কার ও ফলা চিহ্ন শেখাতে যাবেন না। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ন যাতে এলোমেলো ভাবেই বলতে পারে- এভাবে শিখাবেন। প্রথম শ্রেণির শুরুতে শিশুকে কার চিহ্ন ও ফলা চিহ্নের উচ্চারণ ছবি দেখিয়ে টানা মুখস্ত করাবেন। কার ও ফলা চিহ্ন দেখেই ওরা সহজে মনে রাখতে পারবে কারণ ওদের ব্রেইন শক্তি তীক্ষ্ণ ও পরিষ্কার। নিন্মের ছবি অনুসরণ করুন-

চিত্র- স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ- ‘কার’ ফলা
কার চিহ্নগুলোর উচ্চারণ শুদ্ধভাবে মুখস্ত করান। এলোমেলোভাবে যেন বলতে পারে- এভাবে শিখাবেন। এলোমেলোভাবে পুরোপুরি লিখতে না পারলেও সমস্যা নাই। আগে ছবি দেখে মুখস্ত করা শিখবে তারপর লিখবে।

ধাপ-২: নিচের ছবি অনুযায়ী ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে ‘কার’ চিহ্ন যুক্ত করে উচ্চারণ শিখান। আবারও বলি এখন লিখানোর চেষ্টা করবেন না, টানা মুখস্ত করাবেন। নামতা মুখস্ত করার মত মুখস্ত করাবেন। সঠিক উচ্চারণ এবং মুখের জড়তা ভাঙ্গানোই আমাদের মূল লক্ষ।

চিত্র- ব্যঞ্জনবর্ণের এই ৩ টি চিহ্ন একা উচ্চারিত হয়ে পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে না। তাই এরা ব্যঞ্জনবর্ণ হয়েও অন্য ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে যুক্ত হয়ে পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে। এজন্য ১০ টি ‘কার’ চিহ্নের সাথে এই ৩টি বর্ণকে যুক্ত করে উচ্চারণ করানো হয়।
এভাবে প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে উচ্চারণ মুখস্ত করান। বাচ্চাদের সবগুলো বর্ণ মুখস্ত করতে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ দিন লাগবে।
ধাপ-৩: কার চিহ্নের উচ্চারণ আয়ত্ত করা হলে ছয়টিফলা’ চিহ্নের উচ্চারণ মুখস্ত করাবেন।। যথা; য, ব, ম, র, ল ও ন-ফলা। ব্যঞ্জনবর্ণের ফলা ছয়টি যথা; য, ব, ম, র, ল, ন-ফলা। নিচের চিত্র অনুসরণ করুন:

চিত্র- ‘য-ফলা’


চিত্র- ‘র-ফলা’


চিত্র- ‘ল-ফলা’


চিত্র- ‘ব-ফলা’


চিত্র- ‘ন-ফলা’


চিত্র- ‘রেফ-ফলা’। র এর উচ্চারনণের সাহায্যকারী ফলা বলা হয় ‘রেফ’ ফলাকে।

বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি এভাবে কার ও ফলা চিহ্নের উচ্চারণ মাত্র দুই সপ্তাহ চর্চা করান। ছোটবেলায় আমরা যেভাবে চোখ বন্ধ করে নামতা মুখস্ত করতাম সেভাবে চর্চা করাবেন। মাঝেমাঝে না দেখে এক নিঃশ্বাসে কতটুকু মুখস্ত বলতে পারে তা মূল্যায়ন করবেন। যারা ছোটবেলায় আদর্শলিপি বইয়ের মাধ্যমে বর্ণ পরিচয়, বানান শিখেছেন উনারা ভালো জানবেন যে, বাংলা বানান ও রিড়িং পড়াতে কার ও ফলার উচ্চারণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। লেখক সীতানাথ বসাক এর লেখা ‘আদর্শলিপ’ বইটি সংগ্রহ করে বানান চর্চা করান।

 

তথ্য সহায়তা- “আদর্শলিপি ও সরল বর্ণ পরিচয়” সীতানাথ বসাক

@শরশ দিগন্ত
Share on Google Plus

0 comments:

Post a Comment