| মাজারের মূল অংশে ওঠার সিঁড়ি। (ছবি- শরশ দিগন্ত) |
দোয়া শেষ করে বের হওয়ার সময় কবরের সাথে লাগানো একটু ভীরের মধ্যে কৌতুহলবসত উকি দিলাম। আগন্তকদের হাতে কাগজে মোড়ানো কি যেন দিচ্ছে । অনেকেই নিচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম- কী এটা?
লোকটি জবাব দিলো- মাটি! নেন টাকা লাগবে না, ফ্রী।
- মাটি দিয়ে কি করে?
সে বললো, নিয়্যাত করে খায়।
- কিভাবে খাবে?
সে উত্তর দিলো- গ্লাসের মধ্যে পানিতে গুলিয়ে খাবে।
| মাটির পুটলি। (ছবি- শরশ দিগন্ত) |
এখানে যারা আসে তাদের অনেকেই বিভিন্ন নিয়্যাত করে আসেন। মানত, বিয়ে হয় না, বাচ্চা হয় না, ছেলে বাচ্চা চাই, বিদেশ যেতে চাই, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার অমিল, স্বচ্ছলতা, চাকুরী ও ব্যবসায় উন্নতি ইত্যাদি।
| অতি ভক্তি করে ভক্তরা আগরবাতির ছাই খাচ্ছে। (ছবি- শরশ দিগন্ত) |
আবার কেউ কেউ আখিরাতের সুপারিশকারীও মনে করে দোয়া চায়। কিন্তু আল্লাহ্ ব্যতীত সুপারিশের কেউ মালিক নয়, অধিকারী নয়, অতএব তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখে না আয়াতুল কুরসীর মধ্যে আল্লাহ্ তা'য়ালা বলেন, “কে সেই এমন ব্যক্তি যে আল্লাহর কাছে তাঁর অনুমতি ব্যতীরেকে কারো জন্যে সুপারিশ করতে পারবে?” (সূরা বাকারাঃ ২৫৫)। আল্লাহ্ আরো বলেন, “তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ কারো জন্যে সুপারিশ করতে পারবে না” (সূরা ইউনুসঃ ৩)। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, হাশরের মাঠে মানুষ যখন বিপদে পড়ে যাবে এবং অসহনীয় আযাবে গ্রেপ্তার হবে, তখন তারা একজন সুপারিশকারী খুঁজে ফিরবে। যাতে করে তারা এই ভীষণ সংকট থেকে রেহাই পেতে পারে। প্রথমে তারা আদম (আঃ) এর কাছে গমণ করবে। অতঃপর পর্যায়ক্রমে নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা (আঃ) এর কাছে যাবে। তাঁরা কেউ সুপারিশ করতে সাহস করবেন না। প্রত্যেক নবী নিজেদের অক্ষমতার কথা প্রকাশ করবেন। অবশেষে তারা নবী করীম (সঃ) এর কাছে আসবে। তিনি মানুষকে এই বিপদজনক অবস্থা হতে মুক্ত করার জন্য আল্লাহর আরশের নীচে সিজদাবনত হবেন। আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তণ করবেন। তখন আল্লাহ্ তাঁকে মাথা উঠিয়ে প্রার্থনা করার অনুমতি দিবেন। তিনি তখন সমগ্র মানুষের হিসাব-নিকাশের জন্যে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন। মহান আল্লাহ্ তাঁর দুআ এবং শাফাআত কবুল করবেন।(সহীহ্ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিম)।
কবরকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষ জড়ো হওয়া ও উৎসব করাও ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সঃ) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত কর না এবং আমার কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত কর না। তোমার, আমার ওপর দরুদ পাঠ কর। তোমরা যেখানেই থাক না কেন তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হবে।’ (আবু দাউদ- ২০৪২)।
তাহলে আমরা কি কবর জিয়ারত করতে পারবো না? -হ্যাঁ অবশ্যই পারবো, কিন্তু তা হতে হবে আমাদের নবী করীম (সঃ) এর শেখানো সুন্নত মোতাবেগ। কবর জিয়ারতের সুন্নত তরীকা হচ্ছে, কবরের কাছে গিয়ে সালাম দেয়া। এরপর কবরকে পিছনে রেখে কিবলামুখী হয়ে দাড়িয়ে নিজের জন্য এবং কবরবাসীর মাগফিরাতের জন্য দুআ করা। এছাড়া কুরআন মজীদ থেকে কিছু অংশ তেলাওয়াত করা যাবে। হাদীসে কিছু কিছু সূরার বিশেষ কিছু ফযীলতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন দরূদ শরীফ, সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস এবং আরো যেসব সূরা ইচ্ছা পড়া যাবে। কিন্তু কবরের সামনে হাত উঠিয়ে উঠিয়ে দুআ করার জায়েয নাই। (সহীহ মুসলিম ১/৩১৩)। কবরে চুমু খাওয়া, সিজদা করা, তাওয়াফ করা, কবরের উপর ইমারত বানানো, গিলাফ চড়ানো, মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালানো ইত্যাদি একদিকে যেমন শরীয়তের দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ, অপরদিকে তা কবরবাসী ওলীদের প্রতি চরম অবিচার। কেননা, তাঁরা পুরো জীবন শিরক-বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন অথচ মৃত্যুর পর তাদরে প্রতি ভক্তি নিবেদনের নামে ওই সব কাজ-ই করা হচ্ছে। তাদের কবর নিয়ে কিছু ভন্ড মুরীদ, অসৎ ব্যবসায়ীরা যা করছে তা যদি তারা দেখতেন, তাহলে নির্ঘাত বুকচেপে আর্তনাদ করে অভিশাপ দিতে ভুল করতেন না। প্রকৃতপক্ষে সাহাবা, তাবেয়ীন এবং ওলি-বুযুর্গদের পথ-নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের ঈমান আমল ঠিক করা, তাওহীদ ও সুন্নাহ্কে আঁকড়ে ধরা এবং শিরক-বিদআত ও সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমেই তাদেরকে প্রকৃত সম্মান করা যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন।
সংক্ষেপে: হযরত
শাহ পরাণ (রহ.) ছিলেন ইসলাম ধর্মের একজন ধর্মপ্রচারক, সাধক, সূফী, ইসলামের একজন দ্বায়ী,
এক কথায় আল্লাহ্ ওলী। আনুমানিক ৭০৩ হিজরী বা ইংরেজী ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে ৩২ বছর বয়সে
ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারের লক্ষে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশের সিলেটে আসেন। ইসলাম
ধর্ম প্রচারক হযরত শাহ জালাল রহঃ এর অন্যতম সঙ্গী ও অনুসারী ছিলেন হযরত শাহ পরাণ রহঃ।
কথিত আছে হযরত শাহজালাল রহঃ এর ভাগনা ছিলেন হযরত শাহ্ পরাণ রহঃ। কিন্তু শাহ্ পরাণ রহঃ
তার আপন বোনের ছেলে ছিলো নাকি আত্নীয় বোনের ছেলে ছিলো তা জানা যায়নি। হযরত শাহ পরাণ
(রহ.) এর মাজার সিলেট শহরের একটি পুণ্য তীর্থ বা আধ্যাতিক স্থাপনা। এটি সিলেট শহরের
পূর্ব দিকে খাদিম নগর এলাকায় অবস্থিত। শাহ জালালের দরগাহ থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ দুরত্বে
শাহ পরাণের মাজার অবস্থিত। শাহ জালালের (রহ.) দরগাহর মতো এ মাজারেও প্রচুর দর্শনার্থীর
আগমন ঘটে।
* নেটে হযরত
শাহ্ পরাণ রহঃ এর জীবনী পড়ে তার সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু জানতে পারবেন।
0 comments:
Post a Comment